Search
Close this search box.

অধিকারের জন্য সংগ্রাম: বাংলাদেশে ইন্টারনেট সেন্সরশিপের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে তরুণদের অভিজ্ঞতা

এই নিবন্ধটি ইংরেজিতে পাবেন এখানে।

একটিভেট রাইটস এর লেখা এই নিবন্ধটি এঙ্গেজমিডিয়ার ইয়ুথ অ্যাডভোকেসি অ্যান্ড কমিউনিকেশন ফর ইন্টারনেট ফ্রিডম প্রজেক্ট এর আওতায় প্রকাশিত। এই প্রকল্পটির মূল লক্ষ্য হচ্ছে এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলে তরুণদের ডিজিটাল অধিকার সংক্রান্ত বিষয়ে সচেতনতা ও সক্ষমতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে কাজ করা।

একটিভেট রাইটস হলো বাংলাদেশে ডিজিটাল অধিকারকে শক্তিশালী করার লক্ষ্যে তরুণদের একটি উদ্যোগ যারা মূলত ডিজিটাল অধিকার লঙ্ঘন প্রতিরোধে অ্যাডভোকেসি, ডকুমেন্টেশন এবং নেটওয়ার্ক পরিমাপসহ বিভিন্ন কাজ করে থাকে। বাংলাদেশে আরও গণতান্ত্রিক এবং মুক্ত ডিজিটাল পরিবেশ গড়ে তুলতে একটিভেট রাইটস সারা দেশে অন্যান্য আরও স্বেচ্ছাসেবী তরুণ উদ্যোগকে সম্পৃক্ত করে নাগরিকদের জন্য ডিজিটাল অধিকার প্রয়োগের লক্ষ্যে কাজ করে যাচ্ছে।


Image by Activate Rights.
চিত্র: একটিভেট রাইটস

মুখবন্ধ

বাংলাদেশের তরুণরা ক্রমবর্ধমান হারে যুক্ত হচ্ছে ডিজিটাল দুনিয়ায়। সেই সঙ্গে ক্রমে স্বাভাবিক হয়ে উঠছে বাক বাকস্বাধীনতার হরণ এবং ডিজিটাল নিপীড়নের গল্প। ডিজিটাল যুগে দাঁড়িয়ে নিজের অভিমত এবং চিন্তাকে প্রকাশ করতে চাওয়া তরুণ নাগরিকদের সামনে রয়েছে নিপীড়নমূলক আইন, ঘন ঘন ইন্টারনেট শাটডাউন এবং সেন্সরশিপের মত বাধা।

ডিজিটাল বাংলাদেশে তরুণদের প্রতিবন্ধকতা

ধরা যাক, আপনি ১৫ বছর বয়সী এক স্কুলছাত্র। একদিকে মহামারীর অভিঘাত আর অন্যদিকে দৈনন্দিন জীবনের ব্যয় বৃদ্ধি। এর মধ্যে জানতে পারলেন কল রেটের ওপর কর বাড়াতে যাচ্ছে সরকার। অস্বচ্ছল পরিবারে বেড়ে উঠা আপনি সরকারের সিদ্ধান্তে হতাশা প্রকাশ করেন ফেসবুকে। দুই লাইনের ব্যাঙ্গাত্মক রচনার মাধ্যমে সূক্ষ্মভাবে করেন প্রধানমন্ত্রীর শাসনের সমালোচনা।

ঠিক পর দিনই পুলিশের কাছে খবর চলে যায়। নিজেকে আপনি আবিষ্কার করেন কিশোর সংশোধনাগারে। ফেসবুকের ব্যাঙ্গাত্মক রচনার জন্য মানহানির মামলা হয়। থমকে যায় আপনার শিক্ষাজীবন। ন্যায়বিচারের খোঁজে জমিজমা বিক্রি করে দিতে হয় আপনার পরিবারকে। বাংলাদেশে এখন এক প্রশ্নবিদ্ধ শব্দ ‘‌ন্যায়বিচার’।

গল্পটি আপাত অদ্ভুত মনে হলেও প্রায় এমনটিই ঘটেছে মো. ইমনের জীবনে। বাংলাদেশের ময়মনসিংহের বাসিন্দা ইমনকে ২০২০ সালের জুন মাসে গ্রেফতার করা হয়। মামলার জেরে ছাড়তে হয় স্কুলজীবন। তার পক্ষে আইনি লড়াইয়ে গিয়ে জমি হারায় পরিবার। ইমন একা নয়, দেশের অন্তত ৬৮জন কিশোর-কিশোরির জীবনের গল্প অনেকটাই এরকম। ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন ২০১৮-এর অধীনে হয় গ্রেফতার নয়তো কারাবরণ করেছে তারা। আর সেটা স্রেফ অনলাইনে নিজের মত প্রকাশের মাশুল হিসেবে।

বাংলাদেশে কারাগারে যেতে হলে আপনাকে কিছু বলতেই হবে, সব সময় এমন নাও হতে পারে। অন্য এক জনের বক্তব্যও আপনাকে নিতে পারে জেলে। ২০২০ সালে ১৭ বছর বয়সী খাদিজাতুল কুবরাকে গ্রেফতার করা হয় শুধু এইজন্য যে, তিনি একটি ওয়েবিনার সঞ্চালনা করছিলেন। আর সেই ওয়েবিনারের অতিথির বক্তব্য ছিল সরকারের প্রতি সমালোচনামূলক। বিচার শুরুর আগেই খাদিজা এক বছরের বেশি সময় ধরে কারাগারে।

TransEnd-এর প্রতিষ্ঠাতা লামিয়া তানজিন তানহা বলেন, “যেখানে বিভিন্ন সম্প্রদায়ের জন্য বাংলাদেশে মৌলিক মানবাধিকারগুলোই এখনো অধরা; সেখানে ইন্টারনেটের স্বাধীনতার ধারণা অসম্ভব হয়ে উঠতে পারে। ডিজিটাল জ্ঞান ও অ্যাক্সেসের সীমাবদ্ধতা ডিজিটাল দুনিয়ায় আমাদের সম্প্রদায়গুলোর ঝুঁকিকে আরো বাড়িয়ে দেয়।”

সাইবার আইনের বিবর্তন: আইসিটি অ্যাক্ট থেকে সাইবার নিরাপত্তা আইন (সিএসএ)

বাংলাদেশে ডিজিটাল দুনিয়ার সেন্সরশিপ তরুণদের মতো অনেককেই দমিয়ে রাখে। কঠোর ডিজিটাল আইন মূলত মানবাধিকারের প্রতি অসম্মান, আর তরুণদের মধ্যে জাগিয়ে তোলে আতঙ্ক। এইসকল আইন সরকারের স্বচ্ছতা, দুর্নীতি প্রতিরোধ, সংখ্যালঘুর নিরাপত্তা এবং জনকল্যাণের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলি নিয়ে কাজ করার ক্ষেত্রে তরুণদের জন্য প্রতিবন্ধকতা হয়ে দাঁড়ায়। ইন্টারনেট শাটডাউন এবং ওয়েবসাইট ব্লকের মতো ঘটনা তরুণদের জন্য বিভিন্ন দাবিতে আন্দোলন, বাকস্বাধীনতার অনুশীলন, তথ্যপ্রাপ্তি এবং গণতান্ত্রিক জীবনের সক্ষমতাকে সীমাবদ্ধ করে। অবশ্য আজকাল বিষয়টি নিয়ে অনেকেই সরব হচ্ছে। অধিকার এবং কল্যাণ নিশ্চিত করার প্রাত্যহিক লড়াইয়ের পাশাপাশি ডিজিটাল দুনিয়া নিয়েও সচেতন হচ্ছে তরুণরা।

ডিজিটাল মাধ্যমের নানাবিধ আইনি বৈধতা ও নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠার দাবি নিয়ে বাংলাদেশ সরকার ২০০৬ সালে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি আইন প্রবর্তন করে। ২০১৬ সালে সংশোধনীর মাধ্যমে আইনটিতে বিভিন্ন অপরাধের জন্য শাস্তি বাড়ানো হয়। দীর্ঘদিন ধরে এই আইনের ৫৭ ধারাকে ব্যবহার করা হয় সাংবাদিক ও সমালোচকদের দমনে। ক্রমে দেশে বিদেশে বিভিন্ন মানুষ এর বিরুদ্ধে ক্ষুব্ধ হয়ে উঠে। অনেকটা প্রতিক্রিয়া হিসেবেই সরকার ২০১৮ সালের জানুয়ারিতে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন (ডিএসএ) নামে নতুন খসড়া তৈরি করে, যা একই বছরের সেপ্টেম্বরে সংসদে পাশ হয়। ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন আগের তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি আইনের কয়েকটি ধারাকে প্রতিস্থাপন করেছে। নতুন করে সাজিয়েছে অপরাধগুলোকে।

ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের আওতায় সাংবাদিক, আইনজীবি, শিল্পী, শ্রমিক, শিক্ষক, ছাত্রসহ প্রায় সব পেশার মানুষকে আটক করা হয়। সবচেয়ে মর্মান্তিক ঘটনা হলো, ২০২১ সালের ২৫শে ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশী লেখক মুশতাক আহমেদ ডিজিটাল নিরাপত্তা মামলায় প্রায় এক বছর জামিনহীন আটক থাকা অবস্থায় কারাগারে মারা যান

ক্রমাগত বৈশ্বিক বিক্ষোভ ও প্রতিবাদের মুখে গত সেপ্টেম্বর সাইবার নিরাপত্তা আইন ২০২৩ প্রণীত হয়। কিছু শাস্তি কমিয়ে ও কিছু জামিনযোগ্য বিধান প্রবর্তন করা হলেও আগের ডিএসএ আইনে থাকা অস্পষ্টতাকে দূর হয়নি। মানবিক অধিকারের লঙ্ঘন সত্ত্বেও পূর্ববর্তী আইনের মতোই পুলিশকে বিনা পরোয়ানায় তল্লাশি ও গ্রেফতারের ক্ষমতা দেয়া হয়েছে। একই সাথে আইন প্রয়োগকারী সংস্থাকে দেয়া হয়েছে ডিজিটাল মাধ্যম থেকে তথ্য-উপাত্ত অপসারণ এবং ব্লক করার ক্ষমতা।

ডিএসএ এবং আইসিটি আইন বাতিল করেও এদের ভয়াবহতা কাটছে না। আইসিটি আইনের ৫৭ ধারা পাঁচ বছর আগেই অপসারণ করা হয়েছে, অথচ দশ বছরের পুরনো মামলায় গত সেপ্টেম্বরে দুই শীর্ষস্থানীয় মানবাধিকার কর্মীকে এ ধারায় কারাদণ্ড দেয়া হয়। মন্ত্রিসভা সাইবার নিরাপত্তা আইন পাস করার পর আইনমন্ত্রী সংবাদ সম্মেলনে বলেন, ‘পরিবর্তন করা হয়েছে (ডিএসএ), বাতিল করা হয়নি। নামটা নতুন করে দেয়া হয়েছে। কিছু ধারা পরিবর্তন করা হয়েছে।’ মন্ত্রীর ঘোষণামতে, আইসিটি আইনের মামলাসহ ডিএসএ’র অধীনে থাকা ৭০০০টি মামলাও চলমান থাকবে

সংযোগ স্থাপনে নিষেধাজ্ঞা

ডিজিটাল দুনিয়ার এ আইনি বিষয় মানুষের জীবনে সরাসরি প্রভাব ফেলছে। তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আরো কিছু সেন্সরশিপ, যেগুলোর কোন সুস্পষ্ট আইনী ব্যাখ্যা বা বিধান নেই। এর মধ্যে একটি হলো ইন্টারনেট শাটডাউন। এ আর্টিকেলের একজন লেখককেও সে অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হয়েছেন ২০১৮ সালের ৪ আগস্ট নিরাপদ সড়ক আন্দোলনে । দুইজন কলেজ শিক্ষার্থী বাসচাপায় মর্মান্তিকভাবে নিহত হওয়ার পর নিরাপদ সড়কের দাবিতে শুরু হওয়া আন্দোলনে সহপাঠীদের সঙ্গে যোগ দেন তিনিও। আন্দোলন চলাকালে সরকার হঠাৎ করে মোবাইল ইন্টারনেট বন্ধ করে দেয়। এর ফলে পরিবারের সাথে যোগাযোগ করা অসম্ভব হয়ে পড়ে। তখনই প্রথমবারের মতো জোরপূর্বক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করে রাখার ভয়ানক অনুভূতির সাথে পরিচিতি ঘটে।

২০০৯ সাল থেকে বাংলাদেশ নিয়মিত ইন্টারনেট শাটডাউনের সম্মুখীন হয়েছে। এর মধ্যেই রয়েছে যোগাযোগ মাধ্যম ব্লক এবং গতি হ্রাসের (থ্রটলিং) ঘটনা। অপটিমা প্রজেক্ট নামে একটি বহুজাতিক উদ্যোগের প্রতিবেদন অনুসারে, ২০১২ থেকে ২০২২ সালের মাঝামাঝি সময় পর্যন্ত বাংলাদেশে ১৭ বার শাটডাউনের ঘটনা ঘটেছে। ৮৮% বাংলাদেশি জানিয়েছেন যে তারা গত তিন বছরে ইন্টারনেট শাটডাউনের সম্মুখীন হয়েছেন। Access Now-এর প্রতিবেদনের দাবি, ২০২২ সালে শাটডাউনের সংখ্যার দিক দিয়ে বাংলাদেশ শীর্ষ পাঁচ দেশের মধ্যে ছিল। এদের মধ্যে আবার ছয়টিই হয়েছে রাজনৈতিক বিক্ষোভ চলাকালে। এছাড়া রোহিঙ্গা শরণার্থী শিবিরেও ইন্টারনেট পরিষেবা দীর্ঘ সময়ের জন্য বন্ধ করে দেয়া হয়েছে।

ভিন্নমত ও আন্দোলন দমনের জন্য স্বৈরাচারী শাসকদের বহুল ব্যবহৃত কৌশল হলো ইন্টারনেট শাট ডাউন। জনতার বিক্ষোভ ও প্রতিবাদ বন্ধ করতে সরকারগুলোর মধ্যে ইন্টারনেট বন্ধ করে দেয়ার প্রবণতা বাড়ছে। নিরাপদ সড়ক আন্দোলন এবং সাম্প্রতিক সময়ে বিএনপির সমাবেশ থেকেই এর প্রমাণ স্পষ্ট। সরকার বরিশাল, রংপুর, ফরিদপুর ও সিলেটসহ কয়েকটি বিভাগে বিএনপির সমাবেশের সময় মোবাইল ইন্টারনেট পরিষেবা বন্ধ করে দেয়। আর এর পেছনে অজুহাত হিসেবে হাজির করা হয় নিরাপত্তা কিংবা সংঘাত এড়ানোকে। অথচ যখন সরকার ইন্টারনেট বন্ধ করে, সেটা ক্ষতিগ্রস্ত করে জনগণের জীবনযাপনকেই।

যোগাযোগ এবং বিনোদনের বাইরে গিয়ে বর্তমানে জীবনের অপরিহার্য দিক হয়ে উঠেছে ইন্টারনেট। গড়ে উঠেছে অনলাইন ব্যবসা। শক্তিশালী হয়েছে ব্লাড ব্যাঙ্কের মতো গুরুত্বপূর্ণ ও জরুরি পরিষেবাগুলি। সে সব তরুণরা অনলাইন ব্যবসা, খাবার সরবরাহ, ব্লাড ব্যাংক পরিচালনা কিংবা মানবাধিকার ও সমাজকল্যাণে কাজে জড়িত, তাদের ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলছে ইন্টারনেট শাট ডাউন।

ওয়েবসাইটে সেন্সরশিপ

বাংলাদেশে আরো এক প্রকার সেন্সরশিপ দেখা যায়। নির্দিষ্ট কোন ওয়েবসাইট এবং কনটেন্ট ব্লক করে দেয়া হয়, যেন ব্যবহারকারীরা খুঁজে না পায়। বাংলাদেশ সরকার নিয়মিতভাবে অনলাইনে তথ্য-উপাত্ত, বিশেষ করে সমালোচনামূলক ওয়েবসাইট, সংবাদ উৎস এবং সোশ্যাল মিডিয়া ব্লক করে দেয়। জাতীয় স্বার্থ রক্ষার অজুহাতে ধোঁয়াশা রেখেই প্রায়ই বিনা নোটিশে হরণ করা হচ্ছে নাগরিক অধিকার। সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ছে স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা এবং জীবিকার মতো জরুরি পরিষেবা।

অনলাইন সেন্সরশিপে গল্প বাংলাদেশে ঘুরেফিরেই আসে। এর মধ্যে রয়েছে ২০০৯ সালে প্রধানমন্ত্রীর গোপন বৈঠকের ভিডিও ফাঁস হওয়ার পর ইউটিউব ব্লকের মতো ঘটনাও। ২০১৫ সালে ফেসবুক এবং হোয়াটসঅ্যাপের মতো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম বন্ধ ছিল এক মাসের জন্য২০১৬ এবং ২০১৮ সালে সরকার বেশ কিছু নিউজ পোর্টালের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে এবং এর সাথে ২০১৮ সালে বাধাগ্রস্ত হয় গুগলের পরিষেবা। ২০১৯ সালে হাইকোর্টের একটি রায়ের মাধ্যমে হাজার হাজার ওয়েবসাইট ব্লক করা হয়। সবশেষে গত জানুয়ারিতে, ‘রাষ্ট্রবিরোধী খবর’ প্রকাশের জন্য ১৯১ টি ওয়েবসাইট বন্ধ করে দেয়া হয়। এ সব কিছুই ব্যবহারকারীর জন্য অনলাইন দুনিয়ায় সীমাবদ্ধতা আরোপকেই তুলে ধরে।

প্রযুক্তি নিয়ে কর্তৃপক্ষের সীমিত জ্ঞান বাংলাদেশী ফ্রিল্যান্সার এবং প্রযুক্তিনির্ভর পেশাজীবীদেরকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। ২০১৯ সালের ডিসেম্বরে ঘুষ কেলেঙ্কারির প্রতিবেদন প্রকাশের দায়ে সরকার সুইডেন থেকে প্রকাশিত নেত্র নিউজের ওয়েবসাইট ব্লক করে। নেত্র নিউজ গুগল ক্লাউড ফায়ারবেস স্টোরেজ ব্যবহারের চেষ্টা করলে সরকার সেটাও ব্লক করে দেয়। এর ফলে অ্যান্ড্রয়েড অ্যাপ ডেভেলপাররা ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে। একইভাবে লেখালেখির জন্য তরুণদের মধ্যে বহুল জনপ্রিয় আন্তর্জাতিক ওয়েবসাইট মিডিয়াম। সরকারের কভিড-১৯ নীতির সমালোচনামূলক নিবন্ধ প্রকাশের দায়ে সেটাও ব্লক করে দেয়া হয়

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন অ্যাপ ডেভলপার বাংলা নামক নিউজ পোর্টালকে বলেন, ‘একটা ওয়েবসাইটকে ব্লক করলে বাংলাদেশের হাজারো ডেভলপারের জন্য অ্যাপ ডেভলপমেন্টের পথে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করবে… সেটা বোধ হয় তারা (সরকার) চিন্তা করতে পারেনি। একটা সদ্য জন্ম নেয়া ওয়েবসাইটকে ব্লক করার জন্য তারা গোটা দেশের অ্যান্ড্রয়েড অ্যাপ ডেভলপারের কাজের সুযোগ বন্ধ করে দিচ্ছে।’ যারা অনলাইনে নিজেদের কণ্ঠস্বরকে প্রকাশের সংগ্রাম করে যাচ্ছে, বাংলাদেশে তেমন অনেক তরুণের কণ্ঠেই এ ক্ষোভ প্রকাশিত হয়।

ক্ষতির জন্য ক্ষমতার জবাবদিহিতা

ইন্টারনেট শাটডাউনের মতো ঘটনা কখন বিধিসম্মত আর কখন বিধিসম্মত নয়, তার কোন স্পষ্ট আইনি মানদণ্ড নেই। ফলে এ অনিয়ন্ত্রিত প্রয়োগই বিষয়টিকে আরো জটিল করে তুলছে। সরকার এবং বিটিআরসিসহ নীতিনির্ধারকরা বরাবরই জবাবদিহিতাকে এড়িয়ে যায়। ইন্টারনেট শাটডাউন এবং ওয়েবসাইট ব্লকের আগে কিংবা পরে কোন স্পষ্ট ব্যাখ্যা তারা দেয় না। এদিকে মোবাইল ডেটার গতি কমিয়ে এবং ওয়েবসাইট অ্যাক্সেসের বাধাগ্রস্ত করার মাধ্যমে ইন্টারনেট সেন্সরশিপ আরোপে টেলিকমিউনিকেশন কোম্পানিগুলির অদ্ভুত ভূমিকাও সামনে আনা জরুরি। কোম্পানিগুলির বিশাল তরুণ গ্রাহক শ্রেনি আছে। অথচ তারা ব্যবহারকারীদের এমন বিঘ্নতা সম্পর্কে অবগত করার ব্যাপারে কোনোরকম দায়বদ্ধতা দেখায় না। এর মধ্য দিয়ে গ্রাহকদের প্রতি জবাবদিহিতার অভাবটাই স্পষ্ট হয়।

বাংলাদেশে ডিজিটাল অধিকার নিয়ে সচেতনতা তৈরিতে এখনো অনেক পথ বাকি। কিন্তু একে বাস্তবায়ন করতে নানা ধরনের পদক্ষেপ নিচ্ছে তরুণরা। এইতো কয়েক বছর আগেও দেশে ডিজিটাল অধিকার নিয়ে ধারণা ছিলো না বললেই চলে। অথচ বর্তমানে কয়েকটি সংগঠন সক্রিয়ভাবে ডিজিটাল অধিকার নিয়ে কাজ করছে। ইন্টারনেটের স্বাধীনতাকে এগিয়ে নিতে নিযুক্ত রয়েছে আইন প্রণেতাদের ওপর চাপ প্রয়োগ, এ সংক্রান্ত আলোচনা বিনির্মাণ এবং স্থানীয় রিসোর্স তৈরিতে। এরকমই একটি উদাহরণ ইন্টারনেট অধিকার প্রতিষ্ঠায় বাংলাদেশের তরুণদের নেতৃত্বাধীন উদ্যোগ ‘একটিভেট রাইটস’। এ কার্যক্রমগুলি বিরোধী রাজনৈতিক সংগঠনগুলিকেও ডিজিটাল অধিকার নিয়ে উদ্বেগ উত্থাপনে সরব করছে। তারপরও, ইন্টারনেট স্বাধীনতার জন্য এসব তরুণ উদ্যোগগুলিকে এগিয়ে নিতে আরো বেশি অংশগ্রহণ, সহযোগিতা এবং সংহতি প্রয়োজন।


নিবন্ধটির বেশিরভাগ অংশ লিখেছেন সুবিনয় মুস্তফি ইরন। ইন্টারনেট শাটডাউন অংশটিতে সহায়তা করেছেন শোয়েব আব্দুল্লাহ এবং আইনের দিকগুলিতে সাহায্য করেছেন কাজী রাকিব হোসেন। সব প্রদায়করাই অ্যাক্টিভেট রাইটস এর সদস্য।

1 thought on “অধিকারের জন্য সংগ্রাম: বাংলাদেশে ইন্টারনেট সেন্সরশিপের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে তরুণদের অভিজ্ঞতা”

  1. Pingback: Struggles for Rights: Challenges of the Youth to Battle Internet Censorship in Bangladesh - EngageMedia

Comments are closed.