This post is also available in:
English
Malay

লিখেছেন: তাসফিয়া তারান্নুম রিদিতা ও আবদুল্লাহ হেল বুবুন
বাংলাদেশের ডিজিটাল পরিসর অফলাইন সমাজ থেকে আলাদা নয় – বিদ্যমান পূর্বসংস্কার গুলোকেই নতুন মাধ্যমে প্রতিধ্বনিত করে। আর, এই ডিজিটাল পরিসর অনেক সময়ই প্রান্তিক জনগোষ্ঠী গুলোকে মারাত্মক ঝুঁকিতে ফেলে দেয়। বাংলাদেশের মতো দেশে, যেখানে সমলিঙ্গ সম্পর্ক একটি অপরাধ হিসেবে গণ্য হয় এবং জেন্ডারকে শুধুমাত্র পুরুষ বা নারী এই দৃষ্টিভঙ্গিতে দেখা হয়, সেখানে স্বভাবতই ট্রান্সজেন্ডার ও হিজড়া জনগোষ্ঠীর মানুষ বহুবিধ নিপীড়ন ও ভুলবোঝাবুঝির শিকার হয়।
ট্রান্সজেন্ডার ব্যক্তির পরিচয়কে যেভাবে আন্তঃলিঙ্গ ব্যক্তির সাথে মিশিয়ে বা গুলিয়ে ফেলা হয়, তা খুব সুন্দরভাবে উঠে এসেছে লামিয়া তানজিন তানহা পরিচালিত “ইকোস অব এক্সাইল” চলচ্চিত্রে। জেন্ডার যে সামাজিকভাবে নির্ধারিত হয়, এই ধারণাটি বাংলাদেশের সমাজে সম্পূর্ণরূপে উপেক্ষিত। যেমনটা উপেক্ষিত পরিচয় (আইডেন্টিটি) ও জেন্ডারের মাঝের পার্থক্য। এসব ভুল ধারণা ক্ষতিকর স্টেরিওটাইপ গুলোকে আরও শক্তিশালী করে তোলে, যা ফলশ্রুতিতে হিজড়া সম্প্রদায়সহ লিঙ্গবৈচিত্র্য জনগোষ্ঠীর প্রতি সামাজিক কলঙ্ককে গভীরতর করে। এর পরিণতিতে তারা অনলাইন সহিংসতা ও বাস্তব জীবনে আরো বেশী ঝুঁকির মাঝে পড়ে৷
এই ইস্যুটি ইকোস অব এক্সাইল চলচ্চিত্রের বাবুনি ও নিশির লড়াইয়ের মধ্যেও প্রতিফলিত হয়েছে। এই চলচ্চিত্রের দুই প্রধান চরিত্র বাবুনি ও নিশি— উভয়ই হিজড়া ও লিঙ্গবৈচিত্র জনগোষ্ঠীর লোক। ৪২ বছর বয়সী হিজড়া সমাজকর্মী বাবুনি অনলাইন চরমপন্থীদের লক্ষ্যবস্তু হয়ে ওঠে। অন্যদিকে, নারীর পোশাকে নিশির ছবি অনলাইনে ভাইরাল হওয়ার পর তিনি বাড়ি থেকে পালিয়ে বাবুনির আশ্রয় নিতে বাধ্য হন। উভয়ই সামাজিক প্রত্যাখ্যান ও ডিজিটাল সহিংসতার শিকার – তারা বিভিন্ন হুমকিও পেয়েছেন অনলাইনে। অনলাইন বিদ্বেষ যেভাবে বাস্তব জীবনে একাকীত্ব-বিচ্ছিন্নতা ও ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়ায়, তার জ্বলজ্যান্ত উদাহরণ তারা।
বাংলাদেশে ট্রান্সজেন্ডার ও হিজড়া ব্যক্তিরা বহুবিধ চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়। ২০১৩ সালে তৃতীয় লিঙ্গ হিসেবে স্বীকৃতি পাওয়া সত্ত্বেও তারা এখনো সামাজিক প্রান্তিকীকরণ ও আইনী অবজ্ঞার শিকার।
অনলাইন সহিংসতার ধরণ ও প্রভাব
সাম্প্রতিক সময়ে ট্রান্সজেন্ডার পরিচিয় ও অভিব্যক্তি বাংলাদেশী রাজনীতিতে একটি বিতর্কিত ইস্যুতে রূপান্তরিত হয়েছে, যা দেশের প্রগতিশীল ও রক্ষণশীলদের মাঝে বিদ্যমান মেরুকরণকে আরো প্রসারিত করেছে। যার পরিণতি বিভিন্ন রক্ষণশীল গোষ্ঠীর দ্বারা ট্রান্সজেন্ডার ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ডিজিটাল ও বাস্তব জীবনে সহিংস ক্যাম্পেইন। অধিকাংশ সময়েই এই ধরণের ক্যাম্পেইন গুলোকে “পাশ্চাত্য প্রভাব” ও “সাংস্কৃতিক অবক্ষয়” এর বিরুদ্ধে সংগ্রাম হিসেবে উপস্থাপন করা হয়। এই ক্যাম্পেইন গুলো তাদের লক্ষ্য অর্জনে প্রযুক্তির বহুবিধ ব্যবহার নিশ্চিত করে। হেইট স্পিচ, ডক্সিং, সাইবার স্টকিং, মৃত্যু হূমকী, সুসংগঠিত মিস ইনফর্মেশন ইত্যাদি প্রযুক্তি ভিত্তিক কৌশল এক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য৷
বাংলাদেশে প্রযুক্তি-নির্ভর লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতা (TFGBV) ফেসবুক ও টেলিগ্রামের মতো ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মকে চরমপন্থী ঘৃণা প্রচারের কেন্দ্রে পরিণত করেছে৷ এবং তা বাস্তব জীবনে সহিংসতাকে উসকে দিচ্ছে। এসব অনলাইন কর্মকাণ্ড লিঙ্গবৈচিত্র্যসম্পন্ন ব্যক্তিদের পক্ষে লড়াই করা অধিকারকর্মীদের প্রচেষ্টাকেও বাধাগ্রস্ত হয়েছে—২০১৬ সালে অধিকারকর্মী জুলহাজ মান্নান ও মাহবুব রাব্বী তনয়ের হত্যাকাণ্ড অনেক সংগঠনকে গোপনে কাজ করতে বাধ্য করেছে। ২০২২ সালে JusticeMakers Bangladesh লিঙ্গবৈচিত্র্যসম্পন্ন ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ৪৬টি সহিংস ঘটনার নথিভুক্ত করেছে। হিজড়া ও ট্রান্সজেন্ডার জনগোষ্ঠী নিয়ে কাজ করা প্রতিষ্ঠানগুলোও নিরবচ্ছিন্ন আক্রমণের শিকার হচ্ছে।
সংকটের প্রতিক্রিয়ায় সরকারী পদক্ষেপ
প্রযুক্তির মাধ্যমে সংঘটির লিঙ্গ ভিত্তিক সহিংসতার (Technology facilitated gender-based violence) সংখ্যা তাৎপর্যপূর্ণ ভাবে বৃদ্ধি পেলেও সরকারের প্রতিক্রিয়া এখন পর্যন্ত খুবই সীমিত। বিভিন্ন নীতিগত কাঠামোতে ডিজিটাল নিরাপত্তা ও মানবাধিকার সংযোজিত হলেও, এর বাস্তবায়ন কার্যকরভাবে হচ্ছে না। নাগরিক সংগঠন ও এনজিও গুলিকে নিজেদের উদ্যোগেই এই জটিল সমস্যা সামলাতে হচ্ছে। তবে নেতিবাচক সামাজিক পরিবেশের কারণে অনেক ক্ষেত্রেই এ নিয়ে সচেতনতামূলক প্রচারের পরিবর্তে নিজেদের নিরাপত্তার নিশ্চিতকরণকে তারা অগ্রাধিকার প্রদান করছে।
বেসরকারী খাত ও নাগরিক সমাজের কিছু উদ্যোগ লিঙ্গ ভিত্তিক সহিংসতার বিরুদ্ধে শক্তিশালী প্রতিরোধ শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। কিছু ক্যাম্পেইন ঝুঁকিপূর্ণ এবং প্রান্তিক এই জনগোষ্ঠীর জন্য ডিজিটাল সাক্ষরতা ও সাইবার নিরাপত্তা প্রশিক্ষণের ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে, আবার কিছু উদ্যোগ অনলাইনে বিদ্যমান হেইট স্পিচের বিরুদ্ধে কঠোর নিয়ন্ত্রণের দাবি তুলছে (যা অনেক সময়ই গণতান্ত্রিক চেতনার পরিপন্থি রূপ গ্রহণ করে)। তবে এসব প্রচেষ্টা এখনও প্রযুক্তি সমর্থিত লিঙ্গ ভিত্তিক সহিংসতার মতো কাঠামোগত সমস্যা মোকাবেলার জন্য প্রয়োজনীয় ব্যাপকতা ও প্রাতিষ্ঠানিক সমর্থনের অভাবে পিছিয়ে রয়েছে।
ভবিষ্যৎ পদক্ষেপঃ ডিজিটাল সমতা ও নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ
বাবুনি ও নিশির মতো লিঙ্গবৈচিত্র্যসম্পন্ন সম্প্রদায়ভুক্ত ব্যক্তিরা যেসব ডিজিটাল চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হয়, তা সমাধানের জন্য বহুমুখী পদক্ষেপ গ্রহণ করা প্রয়োজন। অনলাইন হয়রানির বিরুদ্ধে শক্তিশালী আইন, ভুল ধারণা ভাঙনে জন শিক্ষা কর্মসূচী এবং সোশ্যাল মিডিয়া প্লাটফর্ম গুলিকে জবাবদিহিতার আওতায় আনা — প্রান্তিক জনগোষ্ঠী গুলোর ডিজিটাল সমতা ও নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণের পূর্বশর্ত। আর, তা অর্জনে এনজিও ও অধিকার কর্মীদের সঙ্গে সমন্বিত প্রচেষ্টার মাধ্যমে নিরাপত্তা কাঠামো গড়ে তুলতে হবে, আর সাপোর্ট নেটওয়ার্ক গুলোকে আইনি সহায়তা, কাউন্সেলিং ও আশ্রয়ের ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে।
বাংলাদেশে ডিজিটাল পরিসর একদিকে যেমন নিজেকে প্রকাশের সুযোগ দেয়, অন্যদিকে লিঙ্গবৈচিত্র্যসম্পন্ন ব্যক্তিদের প্রতি সহিংসতাকেও উসকে দেয়, যার ফলে নিশির মতো কেউ কেউ বেঁচে থাকার জন্য পালিয়ে বেড়ায় এবং বাবুনিরা চিরদিনের জন্য নিজেদের বাড়ি ছাড়ে বাধ্য হয়। এ জাতীয় ঘৃণার বিরুদ্ধে লড়াই এবং নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে অন্তর্ভুক্তিমূলক প্ল্যাটফর্ম, সরকারি পদক্ষেপ ও জনসচেতনতা অপরিহার্য।
এবং পদক্ষেপ গ্রহণের সময় এখনই৷